শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

ব্রেকিং
জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদের পাতায় আপনাকে স্বাগতম
‘জাপানি’ হান্নান ও তাঁর কথিত চাঁদনগর

‘জাপানি’ হান্নান ও তাঁর কথিত চাঁদনগর

‘জাপানি’ হান্নান ও তাঁর কথিত চাঁদনগর

Spread the love

নিজস্ব প্রতিনিধি: রাজধানীর দক্ষিণখান থানাধীন আইনুসবাগ (চাঁদনগর) এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম হান্নান ওরফে (জাপানি হান্নান)। অতীতে তিনি জাপানে গিয়েছিলেন। এলাকায় দুই কাঠা জমির ওপর তার একটি বাড়ি, নাম ‘জাপানি কটেজ’। এছাড়াও নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে জানান দিতে বাড়ির সামনে লাগিয়েছেন ছবিসহ বিভিন্ন সাইনবোর্ড।

দক্ষিণখানে সবাই তাকে জাপানি হান্নান অথবা সাইনবোর্ড হান্নান নামে বেশি চেনেন। এলাকায় তিনি দাপট দেখিয়ে চলাফেলা করেন। তিনিসহ তার ভাই-বোনের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে অনেকটাই ভীত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশের তথ্যমতে, দক্ষিণখান থানায় ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে ১১টি মামলা, ১৩টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আদালতে একটি মামলা হয়েছে জাপানি হান্নানের নামে।

গত ২৪ মার্চ দক্ষিণখানের আইনুছবাগে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ী আবদুর রশীদ। অভিযোগ উঠেছে, জাপানি হান্নানের শটগানের গুলিতে তিনি নিহত হন। ওই ঘটনায় আমিনুল ও তাঁর ১৩ সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় আমিনুলসহ আটজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ৫০-৬০ জন নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন আমিনুল। তাঁর অন্য সহযোগীরা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ বলেন, ‘জাপানি হান্নান’–এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এখনো নানা ধরনের অভিযোগ আসছে। আইনুছবাগের আধিপত্য ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এলাকায় কেউ কিছু করতে গেলেই তাঁকে চাঁদা দিতে হতো। রশীদ হত্যার পর পুলিশ তাঁর বাসায় অভিযান চালিয়ে একাধিক অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে।

হান্নান থেকে জাপানি হান্নান ও সাইনবোর্ড হান্নান:

স্থানীয়রা জানায়, দক্ষিণখান এলাকায় একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে রেষারেষির কারণে ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশ থেকে পালিয়ে জাপানে পারি জমায় হান্নান। সেখানে থেকেও বছরে কয়েকবার দেশে এসে ঘুরে গেছেন তিনি। তবে বিএনপি সরকারের আমলে ২০০৪ সালে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর বাড়ি নির্মাণ করেন। নাম দেন জাপানি কটেজ। সেই থেকে এলাকায় সবাই তাকে জাপানি হান্নান বলে চেনেন।

এছাড়া ওই এলাকায় যেসব কমিটি বা সংগঠন হোক না কেন জোরপূর্বক সেসব কমিটিতে তিনি স্ব-ঘোষিত সভাপতি হিসেবে পদ নিয়ে নেন। সেটা মসজিদ কমিটি হোক আর এলাকার কোনো সংগঠনেরই হোক। এদিকে তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয় দিয়েও অপকর্ম করতেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে ছবি দিয়ে বিভিন্ন পোস্টার, ব্যানার ও সাইনবোর্ড তৈরি করে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঝুলিয়ে দিতেন। এ থেকে তার নামকরণ হয় সাইনবোর্ড হান্নান। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক রানা জানান, আমিনুল ইসলাম হান্নান নামে আমাদের সংগঠনে কোনো পোস্টধারী নেতা নেই।

No description available.

দক্ষিণখানের আইনুসবাগের নাম কীভাবে চাঁদনগর হলো?

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জাপানি হান্নানের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চাঁদপুরের মতলবে। তার বাবা এখানে এসে জমি কিনেছিলেন অনেক আগে। এরপর জাপান থেকে ফিরে এসে হান্নান আরও দুই কাঠা জমি কিনেন। পরে এখানে বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়ির নাম দেন জাপানি কটেজ। নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এবং নিজেই এলাকার নাম পরিবর্তন করেন। যদিও কাগজে কলমে এখনও এখানকার নাম রয়েছে আইনুসবাগ। কিন্তু হান্নান তার নিজ জেলা চাঁদপুরের সঙ্গে মিল রেখে এলাকার নামকরণ করেন চাঁদনগর।

অস্ত্রের ভয় ও তার বাহিনীর ভয় দেখিয়ে এলাকার বাসিন্দাদের এ নাম ব্যবহারে বাধ্য করেন হান্নান। এবিষয়ে বিমানবন্দর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সোহেল তার সঙ্গে কথা বলেছিলো। কিন্তু এবিষয়ে হান্নান বলেছেন আমি সরকার, আমি এ এলাকার প্রতিনিধি। চাঁদনগর নাম আমি দিয়েছি। এ নামই থাকবে। সম্প্রতি চাঁদনগর কল্যাণ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করে তিনি এর প্রধান উপদেষ্টা হন।

আইনুছবাগে অন্তত ৫০০টি বাড়ি আছে। ১০ বছর ধরে ম্যাক্স সোশ্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের ব্যানারে ‘জাপানি হান্নান’ প্রতিটি ঘর থেকে ১৫০ টাকা চাঁদা নিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করছেন বলে অভিযোগ।

আইনুছবাগের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, হান্নান তাঁর বাহিনীর সশস্ত্র মহড়ায় এলাকাবাসীকে তটস্থ রাখতেন। সামনে ও পেছনে মোটরসাইকেলের পাহারায় কালো কাচঘেরা ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডযুক্ত গাড়িতে চলতেন। ২০১০ সালে বিমানবন্দরের উল্টো দিকের হাজি ক্যাম্প থেকে আইনুছবাগ পর্যন্ত অননুমোদিত অটোরিকশা সার্ভিস চালু করেন।

এই রুটে অন্তত ৫০টির মতো অটোরিকশা চলছে। প্রতিটি অটোরিকশা থেকে মাসে দুই হাজার টাকা করে চাঁদা তোলে হান্নানের লোকজন। এ ছাড়া এলাকায় কেউ বাড়ি নির্মাণ শুরু করলে ১ থেকে ২০ লাখ, প্রতিটি বিদ্যুৎ–সংযোগের জন্য ২০ হাজার, ওয়াসার পাম্পকে নিজের পাম্প দাবি করে প্রতি সংযোগ থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা নিতেন।

আইনুছবাগের ১৩০ বাসিন্দা ২০১৫ ও ২০১৯ সালে হান্নানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার, র‌্যাবের কাছে একাধিক আবেদন করেন। কিন্তু এত দিন তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার শহিদুল্লাহ বলেন, আগের পুলিশ কী করেছে, তা তিনি জানেন না। তবে তিনি কয়েক মাস আগে যোগ দিয়েছেন। রশীদ হত্যাকাণ্ডের পর ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সাতটি মামলা নিয়েছেন। এসব মামলা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।


Comments are closed.




© All rights reserved © 2018 sangbaderpata.Com
কারিগরি সহায়তায় ইঞ্জিনিয়ার বিডি