মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১২:৫২ পূর্বাহ্ন

ব্রেকিং
জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদের পাতায় আপনাকে স্বাগতম
হিন্দু উগ্রবাদী কার্যক্রম বিজেপির: সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

হিন্দু উগ্রবাদী কার্যক্রম বিজেপির: সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

হিন্দু উগ্রবাদী কার্যক্রম বিজেপির: সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

Spread the love

২০১৯ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোটের ইস্যু হলো- রাফায়েলসহ একগুচ্ছ নরেন্দ্র মোদির দুর্নীতি। ক্ষমতাসীন গেরুয়া -বাহিনীর ইস্যু হলো অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। ২৬ বছর আগে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভেঙে ’৯৮ সালে প্রথম বাজপেয়ির নেতৃত্বে এনডিএ সরকার গঠন করে বিজেপি। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় বিজেপিওয়ালারা দিল্লিতে ক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু এবার তারা ক্ষমতাসীন। উত্তর প্রদেশের ক্ষমতায় গেরুয়া-সন্ন্যাসী-যোগী আদিত্যনাথ। হঠাৎ তাদের রামমন্দির তৈরি নিয়ে তৎপরতা কেন? তার পরিণামই বা কী দাঁড়াতে পারে? এখনই তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অযোধ্যার বিতর্কিত জমি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে তিন দশক ধরে যে মামলা চলছে, প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বে ডিভিশন বেঞ্চ গত মাসে গেরুয়াবাহিনীকে বলে দিয়েছে আদালতের সামনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা আছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অযোধ্য নয়। সুতরাং ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো একসময় এই মামলার শুনানি চলতে পারে। ব্যস! তেতে উঠেছে মোদিবাহিনী। তারা মনে করেছিল ২০১৯ সালে নির্বাচনের আগেই সুপ্রিম কোর্টের রায় তাদের পক্ষে যাবে। কিন্তু বিধিবাম! দেশের আইন তা চায়নি। আদালতও দাঙ্গা-হাঙ্গামা এড়িয়ে যেতে চেয়েছে। স্বভাবতই দুর্নীতিগ্রস্ত মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টের রায় ও প্রতিরক্ষা- ফ্রান্স থেকে যুদ্ধবিমান কেনার ঘুষ কেলেঙ্কারি নিয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতের ১৯টি বিরোধী রাজনৈতিক দল একই ছাতার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে। তারা সবরকম হাতিয়ার ব্যবহারের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনোটাই যখন জনগণ গ্রহণ করছে না, তখন তারা ’৯২ সালে যে কায়দায় যেভাবে রথযাত্রা বের করে বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল সেই জায়গায় মন্দির বানানোর জন্য দেশব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে। সেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙার পক্ষে ছিলেন না অটল বিহারি বাজপেয়ি। সেদিন নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলী মনোহর যোশী এবং আরও অনেকে। এ দুজন এখন বিজেপিতে কোণঠাসা হয়ে রয়েছেন। কিন্তু উঠে এসেছেন গ্যাং অব থ্রি। গুজরাটের প্রধানমন্ত্রী, গুজরাট বিজেপি সভাপতি ও নাগপুরের আরএসএস প্রধান। এ তিনজন ভারতের ১২৫ কোটি মানুষকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। নাগপুর থেকে হুকুম জারি করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট নয়, আমরা নিজেরাই আইন করে ১৯-এর নির্বাচনের আগেই উগ্র হিন্দুদের উসকানি দিয়ে মন্দির তৈরি করব।

উত্তর প্রদেশের গেরুয়াধারী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, মন্দির তৈরির সরঞ্জাম তিনি অযোধ্যায় পাঠাতে শুরু করেছেন। তারা যে সরঞ্জাম পাঠাচ্ছেন, তা বিজেপির চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে। তাই গোটা ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য আতঙ্কিত হয়ে রয়েছে। তারা আরও স্থির করেছে, দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না। চলতি মাসের শেষে ভারতের চলতি লোকসভার শেষ শীতকালীন অধিবেশন বসবে। সেই অধিবেশনে প্রাইভেট মেম্বার বিল আনা হবে। ভারতের সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে বিল আনতে পারেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে এ বিল পাস করিয়ে তারা মন্দির তৈরি করবেন। কিন্তু তা কি আইনগ্রাহ্য হবে? কারণ গোটা বিষয়টিই এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। এ ধরনের কোনো বিল সংসদে পাস হতে পারে না। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির মুখপাত্র এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ইস্যুটি রামমন্দিরের নয়। ইস্যুটি মসজিদেরও। বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির ছিল কিনা, তা এত বছরেও কেউ প্রমাণ করতে পারেননি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বিশেষজ্ঞ একাধিক আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, ফলি নরিম্যানরা মন্তব্য করেছেন, বিজেপি যে কর্মসূচি দিয়েছে তা সংবিধান-বিরোধী।

দেশের মানুষ শান্তি চায়, স্বস্তি চায়, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চায় না। সুতরাং বিজেপির হিন্দু উগ্রবাদী কার্যক্রম মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। প্রশান্ত ভূষণ আরও বলেছেন, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গেরুয়া পোশাক পরে যা খুশি তাই করতে পারেন না। দেশের আইনকে কোনো একটি বিশেষ দল তাদের হাতে তুলে নিতে পারে না। এদিকে যে ইস্যু নিয়ে বিরোধীরা রাস্তায় নেমেছেন সে ইস্যুটি হলো মোদি ও তার সরকারের ভূরি ভূরি দুর্নীতি। অযোধ্যার বিতর্কিত জমির মালিককে নিয়েও যথেষ্ট বিতর্ক হচ্ছে। সরকারি খাতাপত্রে ওই জমির একজন মালিক সুন্নি ওয়াক্্ফ বোর্ড। সুতরাং এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় দেবে দেশের শীর্ষ আদালত। যেখানে কয়েক বছর ধরে মামলাটি পড়ে আছে। মোদির বেশ কয়েকটি দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসে যাওয়ায় ১৯৮৫-৮৬ সালের রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে বফোর্স মামলায় দিল্লি হাই কোর্ট রায় দিয়েছিল এ ব্যাপারে কোনো দুর্নীতি হয়নি। দেশের আইন অনুযায়ী ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ৯০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা শীতারামণ মোদির পরামর্শে ১ নভেম্বর বফোর্স মামলা আবারও খুঁচিয়ে তুলেছিলেন। শীর্ষ আদালতে প্রধান বিচারপতি গগৈর নেতৃত্বে ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটি খারিজই করেনি, ৪ হাজার ৫৪২ দিন পর সিবিআই কেন এ মামলাটি নিয়ে লড়ল, তা নিয়ে তীব্র ভর্ৎসনা করেছে মোদি সরকারকে। এমনটা যে ঘটতে পারে তা আগেই সরকারকে জানিয়েছিলেন ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেনুগোপাল। তার আশঙ্কাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

১২ বছর পর নতুন করে মামলাটি আর তুলতেই দেয়নি দেশের শীর্ষ আদালত। কংগ্রেস সভাপতির রাফায়েল আক্রমণ ঠেকানোর জন্যই বিজেপি সেই পুরনো বফোর্স মামলা খুঁচিয়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু ভারতের শীর্ষ আদালত তাতে জল ঢেলে দিয়েছে।

কোনো কিছুতেই যখন বিরোধীদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারছে না, তখন গত ৩ নভেম্বর বিজেপির শিখ সমর্থকরা দিল্লিতে ১০ নম্বর জনপথে সোনিয়া গান্ধীর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখায়। তাদের দাবি, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার দিনে দিল্লিতে কংগ্রেস শিখবিরোধী দাঙ্গা করেছিল। তাদের বিচার করতে হবে। ইতিমধ্যে একাধিক কমিশনের রিপোর্টে দেখা গেছে, ওই দাঙ্গায় কংগ্রেসের যে চার নেতা জড়িত ছিলেন তার মধ্যে দুজন মারা গেছেন। এমনও অভিযোগ উঠেছিল যে, সেদিন কংগ্রেসের নাম করে দাঙ্গা বাধিয়েছিল আরএসএস। যদিও সে-সংক্রান্ত ফাইলও সরিয়ে দিয়েছেন মোদি সরকারের বশংবদ অফিসাররা।

মোদি নিজে কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ, তার প্রমাণ পাওয়া গেল গত ৩১ অক্টোবর। ওইদিনই তিনি গুজরাটের কংগ্রেসি নেতা তথা নেহেরু মন্ত্রিসভার উপ-প্রধানমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তার জন্য খরচ হয় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই মূর্তি তৈরি করিয়ে আনা হয় চীন থেকে। তার উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্র ও রাজ্যগুলোয় যে টিভি চ্যানেল আছে, সেখানে যেন ইন্দিরা প্রয়াণের কোনো খবর দেখানো না হয়। তার বদলে দেখানো হবে সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের মূর্তি উদ্বোধনের খবর। তা-ই হয়েছিল।

এত কিছু করেও তিনি ভারতের মানুষের মন ভোলাতে পারছেন না। বাফায়েল কান্ডের অন্যতম অংশীদার ছিলেন অনিল আম্বানি ও নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব চ্যানেলগুলোয় যেসব সমীক্ষা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে কংগ্রেস অনেক এগিয়ে আছে।

মোদি ও তার সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। তার মধ্যে প্রথমেই আছে রাফায়েল ইস্যু। রিজার্ভ ব্যাংক হস্তক্ষেপ, ঋণখেলাপিদের পালাতে দেওয়া, তেলের দাম বাড়ানো, সন্ত্রাস, অসহিষ্ণুতা, শহুরে নকশাল, শিক্ষায় হস্তক্ষেপ প্রভৃতি। রয়েছে নির্বাচন কমিশনে হস্তক্ষেপের অভিযোগও।

দুর্নীতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা বিজেপি ও গেরুয়াবাহিনী রাস্তায় নেমে পড়েছে ’৯২-এর ধাঁচে দেশে দাঙ্গা লাগাতে। মাঝে মোদি একবার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকেও টেনে এনেছিলেন। নেতাজির তৈরি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি দিবস উপলক্ষে নেহেরু থেকে ইন্দিরা সবাইকে তিনি নেতাজির প্রতি অসৌজন্য দেখানোর অভিযোগ করেন। সেদিনই তার অভিযোগ শুনে নেতাজির নাতি হার্ভার্ডের অধ্যাপক সুগত বসু পাল্টা বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, স্বাধীনতার ২০ বছর পর ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লালকেল্লা থেকে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে নেতাজির ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছিলেন। সুগত বসু আরও বলেছেন, মোদির মতো একজন ষোলো আনা সাম্প্রদায়িক লোকের মুখে নেতাজির কথা মানায় না।

ব্যর্থতার সব দায় তিনি ধুয়েমুছে শেষ পর্যন্ত হাতিয়ার করেছেন রামমন্দিরকে। একে সামনে রেখেই তিনি দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছেন। বিজেপি ও সংঘ পরিবারের এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেই একজোট হয়েছে ভারতের বিরোধী দলগুলো। রাফায়েল থেকে শুরু করে অযোধ্যার বিতর্কিত জমি মামলা হয়ে শবরীমালা মন্দির নিয়ে একের পর এক মামলায় সুপ্রিম কোর্টে পর্যুদস্ত হয়েছে মোদি সরকার। ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে গেরুয়াবাহিনী।

শীর্ষ আদালতে রামমন্দির ইস্যুতে তেমন সাড়া না পাওয়ায় এবার শবরীমালা মন্দির নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতে চাইছে গৈরিকবাহিনী।

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক


Comments are closed.




© All rights reserved © 2018 sangbaderpata.Com
কারিগরি সহায়তায় ইঞ্জিনিয়ার বিডি